পবিত্র কোরআন ও হাদিস ছাড়াও দেশে প্রকাশিত ইসলামি বইয়ের বৈচিত্র্য ও সংখ্যা প্রচুর। সেসব বইয়ের সঙ্গে বিদেশি প্রকাশকদের প্রকাশনা নিয়ে বিশাল আয়তনে ইসলামি বইয়ের মেলা শুরু হলো আজ শনিবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব প্লাজা ও সানের সড়কে। সিরাতুন নবী (সা.) হিজরি ১৪৪৭ উপলক্ষে মাসব্যাপী এই ইসলামি বইমেলার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
আজ বিকেলে বায়তুল মোকাররম মসজিদের পূর্ব প্লাজার সামনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনসংলগ্ন সড়কে মঞ্চ করে আয়োজন করা হয়েছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এ সড়কের দুই পাশ দিয়ে ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে মেলার কাঠামো। স্টলগুলোতে সাজসজ্জার কাজ চলছিল। প্রথম দিনের বইমেলায় যেমন হয়। তবে মসজিদের দোতলার পূর্ব প্লাজার বেশির ভাগ স্টলেই বইপুস্তক সাজানো হয়েছে। প্লাজার দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে বিদেশি প্রকাশনীর স্টল।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন জানায়, এবারই প্রথম বিদেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়েছে। লেবানন, মিসর ও পাকিস্তানের মোট চারটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এসেছে এবার। মেলায় মোট স্টল রয়েছে ১৭৯টি। অংশ নিয়েছে ১৫০টি প্রকাশনা ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। মেলা চলবে আগামী ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ১০টা এবং ছুটির দিনে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তিলাওয়াত করেন জাতীয় মসজিদের মুয়াজ্জিন কারী হাবিবুর রহমান। পরে নাত–এ রাসুল পরিবেশন করেন ওয়াহিদুল ইসলাম। প্রধান অতিথি হিসেবে মেলার উদ্বোধন করে অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ধর্মচর্চা ও ইসলামি মূল্যবোধ উজ্জীবিত করতে এই বইমেলা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ‘গত ৩০ বছরে আমাদের দেশে আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রে উচ্চমানের অগ্রগতি হয়েছে। শুধু পবিত্র কোরআন বা হাদিসের অনুবাদই নয়, আরবি ভাষায় বিশ্বের বিখ্যাত পণ্ডিতদের বিভিন্ন বিষয়ের বই এবং আরবি সাহিত্যের প্রচুর অনুবাদ করেছেন আমাদের তরুণ আলেমরা। এই অনুবাদ আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, নতুন মাত্রা দিয়েছে। সেসব বই পাওয়া যাবে এই মেলায়। এর পাশাপাশি বিদেশি প্রকাশকেরা অংশ নেওয়ায় মেলার বৈচিত্র্য ও গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আগামী বছরগুলোতে যেন আরও বেশি সংখ্যায় বিদেশি প্রকাশকেরা মেলায় অংশ নেন, সেই চেষ্টা করা হবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আবদুস সালাম খানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম আখতার হোসেন প্রামাণিক। বাংলাদেশের প্রকাশকদের পক্ষে আহমদ রফিক, বিদেশিদের মধ্যে লেবাননের প্রকাশক হিশাম আবদুর রহিম ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব ইসমাইল হোসেন বক্তব্য দেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে মিসরের রাষ্ট্রদূত উমর ফাহমি অনুষ্ঠানের উপস্থিত থাকলেও তিনি বক্তব্য দেননি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগের সম্পাদক খলিলুর রহমান। উদ্বোধনের পর অতিথিরা সবাই স্টলগুলো ঘুরে দেখেন।
উদ্বোধনের পর সন্ধ্যায় কিছু কিছু বেচাকেনা শুরু হয়েছিল। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের স্টল থেকে প্রাচ্যবিদদের ইংরেজি ভাষায় ইসলাম চর্চা বইটি কিনছিলেন সাফায়েত তৌসিফ। তাঁর বাসা পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এমফিল করছেন। তাঁর গবেষণার কাজে লাগবে এমন বই খুঁজতেই মেলায় এসেছেন বলে জানালেন। মেলায় বিশেষ কমিশন দিচ্ছে প্রকাশনীগুলো। ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাদের বইতে সর্বনিম্ন ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন দিচ্ছে। এই মেলায় কমিশনের ক্ষেত্রে কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। প্রকাশকেরা তাঁদের সুবিধা অনুসারে সর্বনিম্ন ২৫ থেকে বিভিন্ন হারে কমিশন দিয়ে বই বিক্রি করছেন।
রাহনুমা প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আবু সুফিয়ান জানালেন, তাঁদের প্রকাশনীর বয়স প্রায় ১৩ বছর। তাঁরা মূলত ইসলামি ভাবধারার ফিকশনধর্মী বই বেশি প্রকাশ করেন। সামাজিক উপন্যাস, অ্যাডভেঞ্চার, ভ্রমণকাহিনি মিলিয়ে দুই শতাধিক বই প্রকাশ করেছেন তাঁরা। ইসলামি আইন, ফিকাহ ও গবেষণাভিত্তিক বই প্রকাশ করে ইসলামিক ল’ রিসার্চ অ্যান্ড লিগ্যাল এইড নামের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি। তাদের বিপণন ব্যবস্থাপক সরাফত খান জানালেন, তাঁরা একটি মাসিক সাময়িকীও প্রকাশ করে ইসলামি আইন বিষয়ে। প্রথম দিন সন্ধ্যায় মেলা শুরু হয়েছে। সে কারণে ক্রেতার উপস্থিতি বিশেষ ছিল না। সাধারণ পাঠক ছাড়াও এই মেলার বইয়ের নির্দিষ্ট ক্রেতা আছে। তারা মেলায় এলে বেচাকেনা জমে উঠবে বলেই আশা করছেন প্রকাশকেরা।